
নিউজ ডেস্কঃ সময় উপযোগী ও দূরদৃষ্টি সম্পন্ন সঠিক পরিকল্পনা না থাকায় বিরাট অংকের আর্থিক ক্ষতিতে পড়ছে শতভাগ রাষ্ট্রাত্ত প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ রেলওয়েকে। পরিস্থিতি এতটাই বেগতিক যে চালুর মাত্র ৫ বছরের মধ্যেই বৈদেশিক ঋন পরিশোধ না করেই প্রকল্পটি বাতিল করতে হচ্ছে রেলকে। কুমিল্লার লাকসাম-চিনকি আস্তানা সেকশনে ব্রিটিশ আমলের রেললাইনের সমান্তরালে নির্মাণ করা ৬১ কিলোমিটার মিটারগেজ পথটি ২০১৫ সালের ১৮ এপ্রিল চালু হয়। ১ হাজার ৮১৯ কোটি টাকায় নির্মিত এ রেলপথের মাধ্যমে সেকশনটি উন্নীত হয় ডাবল লাইনে। আয়ুষ্কাল না ফুরালেও রেললাইনটি তুলে ফেলতে হবে। কারণ আট বছর না যেতেই ঢাকা-চট্টগ্রাম-কক্সবাজার করিডোরের উন্নয়নে এই সেকশনসহ লাকসাম-পাহাড়তলী রেলপথকে ডুয়েলগেজ ডাবল লাইনে রূপান্তরে ১৫ হাজার ৯৫৪ কোটি টাকার প্রকল্প নিতে যাচ্ছে রেলওয়ে। রেলওয়ের এই পরিস্থিতি শুধু লাকসাম-চিনকি আস্তানা নয়, অদূরদর্শী পরিকল্পনার কারণে ২ হাজার ২১৬ কোটি টাকায় নির্মিত ৬৪ কিলোমিটার দীর্ঘ গাজীপুরের টঙ্গী-কিশোরগঞ্জের ভৈরব বাজার মিটারগেজ লাইনটিও তুলে ফেলতে হবে। শতবর্ষী রেলপথের সমান্তরালে রেলপথটি চালু হয় ২০১৬ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি। এই সেকশনসহ টঙ্গী-আখাউড়া রেলপথকে ডুয়েলগেজে রূপান্তরে ১৪ হাজার ৫৮৭ কোটি টাকা খরচ ধরে আরেকটি প্রকল্পের প্রস্তাব রয়েছে।
ডুয়েলগেজে রূপান্তরের দুই প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে মাত্র কয়েক বছর আগে চালু হওয়া ৪ হাজার ৩৬ কোটি টাকায় নির্মিত ১২৫ কিলোমিটার মিটারগেজ বাতিল হবে। অথচ রেললাইনের আয়ুষ্কাল ৩০ বছর। জমি অধিগ্রহণের মতো জটিল ধাপ না থাকায় এবং সম্ভাব্যতা যাচাই সমীক্ষা হয়ে যাওয়ায়, সরকারের অনুমোদন, অর্থায়ন এবং ঠিকাদার নিয়োগের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে, কাজ শুরু হতে অন্তত তিন বছর লাগবে। তখনও মিটারগেজ রেললাইন দুটির আয়ুষ্কালের বড় অংশ অবশিষ্ট থাকবে। অথচ দেশে আয়ুষ্কাল ফুরানো বহু রেললাইনে ট্রেন চলছে ঝুঁকি নিয়ে।
এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) ঋণে ২০০৬ সালে অনুমোদিত টঙ্গী-ভৈরববাজার সেকশনে মিটারগেজ রেললাইন নির্মাণের কাজ ২০১১ সালে শুরু হয়ে ২০১৮ সালের জুনে শেষ হয়। এতে এডিবি ২০ বছর মেয়াদে ঋণ দিয়েছে ১ হাজার ৮১৬ কোটি টাকা। ঋণ শোধের আগেই লাইনটি তুলে ডুয়েলগেজ নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়েছে রেলওয়ে। জাপানের আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) ঋণে লাকসাম-চিনকি আস্তানা সেকশনে নতুন মিটারগেজ রেলপথ নির্মাণ প্রকল্প শুরু হয় ২০০৮ সালের জুলাইয়ে। ২০১৮ সালের অক্টোবরে প্রকল্পটি আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হয়। এতে জাইকার ঋণ ৫২৭ কোটি টাকা। এ প্রকল্পে এখনও ঋণ শোধ হয়নি।
ডুয়েলগেজ লাগবে জেনেও মিটারগেজ বানিয়ে ২০১৪ সালের অক্টোবরে রেলওয়ে সিদ্ধান্ত নেয়, সব রেললাইন পর্যায়ক্রমে ডুয়েলগেজে রূপান্তর হবে। ২০১৬ সাল থেকে ৩০ বছরে বাস্তবায়নের জন্য যে মহাপরিকল্পনা করেছে সংস্থাটি, তাতেও বলা হয়েছে দেশের প্রধান রেলপথগুলো ডাবল লাইনে উন্নীত করা হবে। এ যুক্তিতেই ৪ হাজার কোটি টাকার ১২৫ কিলোমিটার রেললাইন তুলে ফেলে সেখানে ডুয়েলগেজ নির্মাণের প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে। আরেকটি যুক্তি হচ্ছে, বহুজাতিক ট্রান্স এশিয়ান রেলওয়ে নেটওয়ার্কে যুক্ত হতে দেশীয় রেলপথ ডুয়েলগেজে রূপান্তর করতে হবে। ২০১৫ সালে প্রকাশিত রেলওয়ে ইনফরমেশন বুক অনুযায়ী, ট্রান্স এশিয়ান রেলওয়ে নেটওয়ার্কে যুক্ত হতে ২০তম দেশ হিসেবে ২০০৭ সালের ৯ নভেম্বর চুক্তিতে সই করে বাংলাদেশ।