
তন্ময় ভক্তঃ বায়ু দুষনের দিল্লিকে পেছনে ফেলে বাতাসের মান সূচকে রাজধানীর ঢাকার অবস্থান সবচেয়ে নিচে নেমে এসেছে। এতদিন বিশ্বের সবচেয়ে বায়ু দুষণের শহর হিসেবে দিল্লির নাম উচ্চারিত হলেও এখন উচ্চারিত হচ্ছে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার নাম। ঢাকার বায়ু দুষণ সোমবার (২৫ নভেম্বর) সকাল ৮টার দিকে এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্সে (একিউআই) বায়ুদূষণে ঢাকার স্কোর ছিল ২৪২। যার অর্থ, ঢাকায় বাতাসের মান ‘খুবই অস্বাস্থ্যকর’। এই তালিকায় ঢাকার পরেই রয়েছে যথাক্রমে ভারতের দিল্লি, পাকিস্তানের লাহোর ও মঙ্গোলিয়ার রাজধানী উলানবাটোর শহর। একিউআই সূচকে দিল্লির স্কোর ২১১ এবং লাহোর ও উলানবাটোরের স্কোর ১৯৮। ঢাকার দূষণ কতটা বিপজ্জনক পর্যায়ে পৌঁছেছে, সেটি তুলে ধরেছে বৈশ্বিকভাবে বায়ুদূষণ পর্যবেক্ষণকারী আন্তর্জাতিক সংস্থা এয়ার ভিজ্যুয়াল।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক এ প্রতিষ্ঠানের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, গতকাল সকাল সাতটা থেকে বিকেল সাড়ে পাঁচটা পর্যন্ত বেশির ভাগ সময় ঢাকাই ছিল বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত বায়ুর শহর। এরপর কয়েক ঘণ্টার জন্য মঙ্গোলিয়ার রাজধানী উলানবাটোর ও ভারতের কোলকাতা শহর দূষণের দিক থেকে ঢাকাকে ছাড়িয়ে যায়। তবে রাত সাড়ে আটটার পর ঢাকা আবার শীর্ষে চলে আসে। যখন কোনো শহরে একিউআই স্কোর ২০১ থেকে ৩০০-এর মধ্যে থাকে, তখন ওই এলাকার বাসিন্দাদের স্বাস্থ্যঝুঁকি লক্ষ করা যায়। এ সময় বাইরে বের হওয়ার ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত বলেও জানানো হয়। যখন কোনো এলাকায় একিউআই স্কোর ৫০-এর নিচে থাকে, তখন ওই এলাকায় বায়ুর মানকে ভালো বলে মনে করা হয়। এ ছাড়া একিউআই স্কোর ৫১ থেকে ১০০-এর মধ্যে থাকলে বায়ুর মানকে মাঝারি হিসেবে ধরে নেওয়া হয়। আর যখন এই স্কোর ১০১ থেকে ১৫০-এর মধ্যে থাকে, তখন তা সংবেদনশীল মানুষের জন্য অস্বাস্থ্যকর বলে ধরে নেওয়া হয়। এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স প্রতিদিন বায়ুর মান নিয়ে প্রতিবেদন দেয়, যার মাধ্যমে কোন শহরে বায়ুর মান কেমন এবং এর ফলে স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে কেমন প্রভাব পড়তে পারে, সে সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।
বাংলাদেশে বায়ু দূষণের উৎস নিয়ে চলতি বছরের মার্চে একটি গবেষণা প্রকাশ করেছে পরিবেশ অধিদফতর ও বিশ্বব্যাংক। তাতে দেখা যায়, দেশে বায়ু দূষণের প্রধান তিনটি উৎস হচ্ছে- ইটভাটা, যানবাহনের কালো ধোঁয়া ও নির্মাণকাজ। আট বছর ধরে এ তিন উৎস ক্রমেই বাড়ছে।২০১৩ সালে পরিসংখ্যান ব্যুরো থেকে দেশের ইটভাটাগুলোর ওপর একটি জরিপ করা হয়। তাতে দেখা যায়, দেশে ইটভাটার সংখ্যা ৪ হাজার ৯৯৫টি। ২০১৮ সালে পরিবেশ অধিদফতরের জরিপে দেখা যায়, ইটভাটার সংখ্যা বেড়ে ৭ হাজার ৯০২টি হয়েছে। এর মধ্যে ২ হাজার ৪৮৭টি ইটভাটা ঢাকা বিভাগের মধ্যে গড়ে উঠেছে। ওই গবেষণার তথ্যানুযায়ী, ২০১০ সালে দেশে মোট যানবাহনের পরিমাণ ছিল ৩ লাখ ৬৯ হাজার ৬৭৭। ২০১৮ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ১৯ হাজার ৬৫৪টিতে। প্রকৃতি সংরক্ষণ বিষয়ক সংস্থাগুলোর আন্তর্জাতিক জোট আইইউসিএন’র এ দেশীয় পরিচালক রাকিবুল আমিনের মতে, বায়ু দূষণ মোকাবিলার প্রথম কাজ হচ্ছে দূষণের উৎস বন্ধ করা।
দ্বিতীয় কাজ হচ্ছে, শহরের বিভিন্ন স্থানে সবুজ বেষ্টনী গড়ে তোলা এবং জলাশয়গুলো রক্ষা করা। এ দূষিত বায়ুর মধ্যে নগরের মানুষ কীভাবে নিরাপদ থাকবে, সে ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা। তবে সবার আগে বায়ু দূষণকে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ সঙ্কট হিসেবে দেখতে হবে। বিশেষ করে ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের অভ্যন্তরে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানসমূহের নির্মাণ সামগ্রী অর্থাৎ মাটি ও বালির একটি অংশ রাস্তার পড়ে যাচ্ছে, যা পরে বাযয় দূষণের সৃষ্টির জন্য বিশেষভাবে ভূমিকা রাখছে। যত্রতত্র ময়লা-আবর্জনা নিক্ষেপ, ড্রেন পরিষ্কার করে ময়লা ড্রেনের পাশেই দীর্ঘদিন রাখা ও সিটি কর্পোরেশনের বর্জ্য পরিবহনের সময় অনিয়ন্ত্রিত পরিবহন ব্যবস্থাপনার ফলে একটি অংশ রাস্তার ফেলে দেয়া হচ্ছে। এ সব বর্জ্য ও ময়লা-আবর্জনার ওপর দিয়ে যানবাহন চলাচলের ফলে বায়ু দূষণের সৃষ্টি হচ্ছে। এ বিষয়ে অবকাঠামো উন্নয়ন ও নির্মাণ কার্যক্রমের বায়ু দূষণ নিয়ন্ত্রণে হাইকোর্ট বিভাগ কর্তৃক সুনিদিষ্ট নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। নির্দেশনা অনুযায়ী পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রতি মাসে হাইকোর্ট বিভাগে পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন দাখিল করতে হয়।
সোমবার (২৫ নভেম্বর) সচিবালয়ে পরিবেশ বন ও জলবায়ু মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে ঢাকার বায়ু ও শব্দ দূষণ বিষয়ে আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রী মো. শাহাব উদ্দিন বলেছেন, ঢাকা সিটিতে বায়ু দূষণের মাত্রা অসহনীয় পর্যায়ে চলে গেছে। রাজধানীর আশেপাশের ইটভাটা, মোটরযানের কালো ধোঁয়া এবং যথেচ্ছ নির্মাণকাজ মূলত
এই তিন কারণে ঢাকাসহ সারাদেশে বায়ু দূষণের এ মাত্রা বাড়ছে। মন্ত্রী শাহাব উদ্দিন বলেন, ঢাকাসহ দেশের বাতাসে দূষণ প্রতিদিনই বাড়ছে। বিশ্বের দূষিত বায়ুর শহরে তালিকার শুরুর দিকে রয়েছে রাজধানী ঢাকা। দূষণের মাত্রা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে মাত্রাতিরিক্ত ধুলাবালি। নগরজুড়ে বিভিন্ন স্থানে খোঁড়াখুঁড়ির কারণে এই ধুলাই হয়ে উঠেছে রাজধানীবাসীর নিত্যসঙ্গী।
তিনি বলেন, গত আট বছর ধরে এই তিন উৎস ক্রমেই বাড়ছে। ফলে বায়ু দূষণ মোকাবিলায় দূষণের উৎস বন্ধ করে শহরের বিভিন্ন স্থানে সবুজ বেষ্টনী গড়ে তুলতে হবে। পাশাপাশি ঢাকার চারপাশের জলাশয়গুলোকে রক্ষা করতে হবে। একইসঙ্গে সরকারি-বেসরকারি অবকাঠমো ও বিভিন্ন কাজে সমন্বয় করা প্রয়োজন।প্রসঙ্গত, জনবহুল ঢাকা বায়ুদূষণে বেশ আগে থেকেই ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। আর কয়েক দিন থেকে বায়ুদূষণে শীর্ষে দেখা যাচ্ছে রাজধানীর অবস্থান। তবে একিউআই অনুযায়ী, শীত ও গ্রীষ্মকালে শহরটিতে বায়ু দূষণ চরমে উঠলেও বর্ষায় অবস্থার উন্নতি দেখা যায়।এদিকে, চলতি মাসেই একিউআই স্কোরে ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যে ছিল ভারতের রাজধানী দিল্লি। এর ফলে স্কুল-কলেজসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করে স্থানীয় প্রশাসন। এছাড়া সবাইকে বাইরে বের হওয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক করে দেওয়া হয়। তবে ওই ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে এখন ভারতের স্কোর অনেকটাই নেমে গেছে।