
নিউজ ডেস্কঃ ‘নয়া উরজা, নয়া গতি’—বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে এমন ভাবনাই জানিয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। তাঁর বার্তাটি ছিল—দুই দেশের সম্পর্কে যে বিশেষ মাত্রা বা গতি এসেছে, তা শুধু অব্যাহত রাখলেই চলবে না; এর গতি আরো বাড়াতে হবে। ভারতের প্রধানমন্ত্রীর বাংলাদেশে দুই দিনের সফরের শেষ দিন গতকাল শনিবার বিকেলে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের বৈঠকে বসে দুই দেশের শীর্ষ প্রতিনিধিদল। ওই বৈঠকের পর ঢাকা ছাড়ার আগে রাত ৮টায় সোনারগাঁও হোটেলে ব্রিফিং করেন ভারতের পররাষ্ট্র সচিব হর্ষ বর্ধন শ্রিংলা। মোদির সফরকে ঐতিহাসিক ও ফলপ্রসূ উল্লেখ করেন তিনি। শ্রিংলা বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আগামী ৫০ বছরের সম্পর্কের ভাবনা তুলে ধরেছেন। দুই নেতাই আলাপ করেছেন পরবর্তী ৫০ বছরের সম্পর্ক নিয়ে।
এর আগে সংবাদ সম্মেলন করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন। বাংলাদেশ ও ভারত—দুই পক্ষের সংবাদ সম্মেলনের সারমর্ম হলো, বাংলাদেশ ও ভারত তাদের সম্পর্কের বিশেষ মাত্রা আরো জোরদার করার ব্যাপারে সম্মত হয়েছে। দুই দেশই আগামী ৫০ বছরের দিকে তাকিয়ে আছে। এ বিষয়ে দুই দেশ কিভাবে কাজ করতে পারে, সেটা নিয়েই আলোচনা হয়েছে। শুধু বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যেই নয়, এই দুই দেশের বাইরেও কানেক্টিভিটি ছড়িয়ে দেওয়ার বিষয়ে কথা হয়েছে।
বৈঠক শেষে সহযোগিতা জোরদারে বাংলাদেশ ও ভারত গতকাল পাঁচটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই করেছে। এমওইউগুলো দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও প্রশমন, বাংলাদেশ ও ভারতের ন্যাশনাল ক্যাডেট কোর, বাণিজ্য বিরোধ নিষ্পত্তিতে সহযোগিতার কাঠামো সৃষ্টি, বাংলাদেশ-ভারত ডিজিটাল সার্ভিস অ্যান্ড এমপ্লয়মেন্টের আইসিটি সরঞ্জাম, কোর্সওয়্যার ও রেফারেন্স বই এবং প্রশিক্ষণ সরবরাহ এবং রাজশাহী কলেজ মাঠ ও আশপাশের এলাকায় খেলাধুলার সুবিধা সৃষ্টির বিষয়ে।
শেখ হাসিনা ও নরেন্দ্র মোদি দুই দেশের বন্ধুত্বের সুবর্ণ জয়ন্তী উপলক্ষে স্মারক ডাকটিকিট উন্মোচন করেছেন। ভারতের প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশকে ১০৯টি অ্যাম্বুল্যান্স ও ১২ লাখ ডোজ ভারতে তৈরি অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকা কভিড ভ্যাকসিন উপহার দিয়েছেন। গতকাল সন্ধ্যার অনুষ্ঠানে নরেন্দ্র মোদি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাতে অ্যাম্বুল্যান্সের প্রতীকী চাবি ও ভ্যাকসিনের প্রতীকী বাক্স তুলে দেন। অন্যদিকে শেখ হাসিনা বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী ও বাংলাদেশের সুবর্ণ জয়ন্তী উপলক্ষে রৌপ্য মুদ্রাসহ অন্যান্য স্মারক তুলে দেন নরেন্দ্র মোদির হাতে।
অনুষ্ঠানে দুই প্রধানমন্ত্রী মিলে তিনটি প্রকল্প উদ্বোধন করেছেন। এগুলো হলো মুক্তিযুদ্ধে মিত্রবাহিনীর শহীদদের স্মরণে আশুগঞ্জে স্মৃতিসৌধ নির্মাণ, কুষ্টিয়ার শিয়ালদহে অবকাঠামো উন্নয়ন এবং পাবনার ঈশ্বরদীতে রূপপুর পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্রে ‘পাওয়ার ইভাকুয়েশন ফ্যাসিলিটিস’ অবকাঠামো নির্মাণ।
মোদির সফরে ১০ ঘোষণা : ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট রেলস্টেশনকে নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশনের সঙ্গে সংযুক্তকারী একটি নতুন ট্রেন পরিষেবা ঘোষণা করা হয়েছে। ভারত-বাংলাদেশের উদ্যোক্তাদের জন্য ‘স্টার্টআপ কনক্লেভ’ ঘোষণা করেছেন নরেন্দ্র মোদি। তিনি ভারতের ‘স্টার্টআপ ইকোসিস্টেমের’ সঙ্গে সংযোগের জন্য ৫০ তরুণ বাংলাদেশি উদ্যোক্তাকে ভারতে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। শিক্ষার মাধ্যমে সংযুক্তির অংশ হিসেবে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের ভারতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে উচ্চশিক্ষার জন্য এক হাজার সুবর্ণ জয়ন্তী বৃত্তি ঘোষণা করেছেন মোদি। এ ছাড়া পারস্পরিক সমঝোতা বাড়ানোর অংশ হিসেবে বাংলাদেশ অধ্যয়নের সুবিধার্থে দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ে বঙ্গবন্ধু চেয়ার ঘোষণা করা হয়েছে।
নরেন্দ্র মোদি সাতক্ষীরার শ্যামনগরের ঐতিহাসিক যশোরেশ্বরী মন্দির পরিদর্শনের সময় ঘোষণা দিয়েছেন, শ্যামনগরের মানুষের সুবিধার্থে ভারত সরকারের অনুদান তহবিলের আওতায় একটি ‘কমিউনিটি হল-কাম-সাইক্লোন শেল্টার’ তৈরি করা হবে। গোপালগঞ্জের ওড়াকান্দিতে মোদি ঘোষণা করেছেন, ভারত সরকারের অর্থায়নে ওড়াকান্দিতে শিশুদের জন্য একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় তৈরি এবং মেয়েদের জন্য একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে আধুনিকায়ন করবে। এ ছাড়া বন্ধুত্বের অঙ্গীকার ৬ ডিসেম্বর দুই দেশ ‘মৈত্রী দিবস’ উদযাপন করবে। এ ছাড়া বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫০তম বছর এবং ভারতের স্বাধীনতার ৭৫তম বছর উপলক্ষে ‘ভারতের সেরা, বাংলাদেশের সেরা প্রদর্শনী’ এবং ব্যাবসায়িক সভা অনুষ্ঠানের ঘোষণা দিয়েছেন নরেন্দ্র মোদি। তিনি আরো ঘোষণা দিয়েছেন, ২০২২ সালে বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত প্রথম ‘এয়ার শোতে’ ভারত অংশ নেবে। নরেন্দ্র মোদি ঘোষণা দিয়েছেন, বাংলাদেশের জাদুঘরগুলোতে প্রদর্শনের জন্য ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে ভারতীয় বাহিনীর ব্যবহৃত সামরিক সরঞ্জাম দেবে ভারত।